চট্টগ্রামে রিয়েল এস্টেট কোম্পানী কোরাল রীফ প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নকশা লঙ্গন করে ১৫ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের অভিযোগ ওঠেছে। একইসাথে জমির মালিককে প্রাপ্য ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে একই ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, জমির মালিকের সাক্ষর জালিয়াতি করে চুক্তি তৈরি, দুই কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আত্মসাৎ, মারধর ও হত্যার হুমকির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী জমির মালিক বাদী হয়ে আদালতে মামলা করলে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের তদন্তে সত্যতা মিলেছে। শুধু তাই নয় কোরাল রীফের করা মামলার কোন সত্যতা পায়নি পুলিশ। অভিযোগ ওঠেছে, রিয়েল এস্টেট কোম্পানী কোরাল রীফ কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে অসংখ্যা জমির মালিকের সাথে প্রতারণা, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে শতশত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আসছে। বর্তমানে কোন ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি একপ্রকার লাপাত্তা। এতে আগ্রাবাদের একটি ভবনের প্রতি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে জমির মালিকের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। যেকো্ন সময় অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, কোরাল রীফের বিরুদ্ধে আদালতে ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা করেন জমির মালিকরা। এরপর কোরাল রীফ ভূমি অপরাধ ও প্রতিকার আইনের জমির মালিককে বিবাদী করে আরও একটি মামলা দায়ের করেন। কিন্তু জমির মালিকের করা মামলায় কোরাল রীফের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা মিললেও কোরাল রীফের করা মামলায় জমির মালিকের বিরুদ্ধে আনা কোন অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। এ নিয়ে সিএমপির ডিবি বন্দর ও পশ্চিমের পৃথক কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তবে এখনও কোন সুরাহা হয়নি ফ্ল্যাট মালিকদের সাথে চলা দ্বন্দ্বের।
মামলা সূত্রে জানা যায়, নগরীর আগ্রাবাদের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড আমানত খান সড়কে খান বাড়িতে ৩৭.৯৫৪৫ শতক জমিতে বা ১৬ হাজার ৫৩৩ বর্গফুট বিশিষ্ট ১৫ তলা ভবন নির্মাণের জন্য জমির মালিক ৩০ জন ওয়ারিশের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় কোরাল রীফের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম। চুক্তি অনুসারে তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ৮ বছর সময় অতিবাহিত করে। ওই চুক্তিতে ৬ মাস গ্রস পিরিয়ড সময় ধরা হয়। এতে মোট ৮৯ টি ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়। চুক্তি অনুসারে ৫০ শতাংশ জমির মালিক ও ৫০ শতাংশ ডেভলাপার কোম্পানী পাবে। ১৫ তলা ভবনটি করতে সিডিএ’র অনুমতি মেলে ২০১৪ সালে। এরপর ওইবছরই কাজ শুরু হয়। চুক্তি মতে তিন বছরের মধ্যে কাজ করা না গেলে মালিককে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সেই হিসেবে মামলার বাদি এক কোটি ৬২ লাখ টাকা প্রাপ্য হবেন। কিন্তু কোরাল রীফ ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোন অর্থ পরিশোধ না করে কালক্ষেপণ করে। এ নিয়ে ২০২৪ সালের জুনে আদালতে মামলা করেন জমির অন্যতম মালিক মো. আমজাদ খানের ছেলে সামিউল খান।
সেই মামলা সূত্রে জানা যায়, বারবার কোরাল রীফকে ন্যার্য্ হিস্যা বুঝিযে দিতে বৈঠক করা হলেও তারা কর্ণপাত করেনি। পরে তারা অন্যান্য ভূমি মালিকের সাথে যোগসাজশ করে সমঝোতা চুক্তি ও আমোক্তারনামা সম্পাদন না করে ২০১২ সালে হওয়া চুক্তিপত্রে শর্ত লঙ্গ করে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষকে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে থাকে। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আগ্রাবাদ ভূমি অফিসে জমির মালিক সামিউল খান, আসিফ খান, আমজাদ খান একটি আপত্তি জমা দেন। এতে ওই ভবনের নামজারি বন্ধ করে দেন আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি)।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, সবশেষ ২০২৪ সালের ২৩ জুন খান বাড়িতে এক বৈঠকে কোরাল রীফ জমির মালিক সামিউল খান, তার বাবা আমজাদ খানকে মারধর করে এবং চুক্তিপত্র অস্বীকার করে কোন ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেয়। পরে তারা ফ্ল্যাট বুঝে নিতে চাইলে জমির মালিকের কাছে ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে।
চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ষষ্ঠ আদালতে দায়ের করা মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিএমপির ডিবি বন্দর-পশ্চিম বিভাগ। তদন্তকারী কর্মকর্তা) এসআই মোহাম্মদ মহসীন উদ্দিন রুবেল প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বাদী সামিউল খান কোরাল রীফের পরিচালক সাইফুল ইসলাম, প্রতিষ্ঠানটির ইনচার্জ জামাল উদ্দিনসহ তার আত্মীয়সহ ১০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। ২০১২ সালের চুক্তি ছাড়াও ২০১৯ ও ২০২৩ সালে কোরাল রীফের সাথে জমির মালিকদের দুটি সম্পূরক চুক্তি হয়। এতে জমির মালিক আমজাদ খান, আসিফ খান, আসাদ খান কোন সাক্ষর করেননি। কিন্তু কোরাল রীফ তাদের নাম ব্যবহার করে ফ্ল্যাট, পার্কি ও অন্যান্য কিছু হস্তান্ত অব্যাহত রেখেছে। উপরের তিন মালিককে তাদের প্রাপ্যও বুঝিয়ে দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। ডিজিটাল সার্ভেতে দেখা যায়, একেকটি ফ্ল্যাটের আকার একেক রকম। চুক্তিতে দোকান না থাকলেও সেখানে দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও বাদী ও তার পিতাকে মারধরে প্রমাণ মিলেছে কোরাল রীফসহ অন্য বিবাদীদের বিরুদ্ধে।
এদিকে কোরাল রীফ জমির পাঁচজন মালিকদের বিবাদী করে আরেকটি মামলা দায়ের করেন। সেখানেও সিএমপির ডিবি (বন্দর-পশ্চিম) তদন্তকারী কর্মকর্তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-৬ এ ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে দায়ের করা মামলার প্রতিবেদন পুলিশ জানিয়েছে, কোরাল রীফ জমির মালিকদের বিরুদ্ধে ১৫টি ফ্ল্যাট দখল করার অভিযোগ করলেও তার সত্যতা মেলেনি। এতে উল্টো প্রমাণ মেলে কোরাল রীফ ক্ষতিপূরণের দেড় কোটি টাকা নিয়ে মালিকদের সাথে গড়িমসি করেছে। আবাসিক ভবন করার কথা থাকলেও সেখানে হোটেল এণ্ড সুইটমিট হিসেবে প্ল্যান অনুমোদন করা হয়েছে। এছাড়াও দোকান, পার্কিংসহ কয়েকটি সেক্টরে শর্ত ভঙ্গ করেছে কোরাল।
সামিউল খান জানান, আমাদের ভবনে প্রত্যেক ফ্ল্যাটে প্রতিষ্ঠানটি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে লাপাত্তা হয়ে যায়। তারা অনেক ফ্ল্যাট একাধিক জনের কাছে বিক্রি করেছে। আমাদের ক্ষতিপূরণতো দেয়নি উল্টো পুরো ভবনে বিশৃঙ্খলা দিয়ে গেছে। কক্সবাজারে বেস্ট ওয়েস্টার্ন হ্যারিটেজ হোটেলে দুটি ফ্ল্যাট বিক্রির কথা বলে আমার বাবার কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা নেয়। সেখানেও দাম নিয়ে প্রতারণা করেছে তারা। কোন মুনাফা দূরে থাক আসলও ফেরতে দেয়নি।